শূন্য দোলনা, আসবে বলেও এলো না সে

আসবে বলেও এলো না সে

Last Updated on

এমাসে প্রায় পনের দিন পিছিয়ে যেতে আশার আলোয় ভেসে একটা প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট কিনে এনেছিল আনিশা। কিন্তু একটা মাত্র রেখা বুক বয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেখে গেল। চুপচাপ সেটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এসে শুয়ে পড়লো। একটু বাদে উঠেই অফিসে দৌড়োতে হবে।  বিকেলে অফিস থেকে ফেরার সময় আবার ওষুধের দোকানটার দিকে চোখ চলে গেল আনিশার। আবার মনে পড়ে গেল, এখনো হয়নি। তাহলে কি আরো কিছুদিন দেখে আবার টেস্টটা করাবে নাকি। তারপর শৌনকের বলা কথাগুলো মনে পড়তেই চুপচাপ বাড়ির পথ ধরলো সে। শৌনক যে কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষার ঘোর বিরোধী। এরকম নয় যে ওরা কোনো ডক্টর কনসাল্ট করায়নি বা অন্যভাবে চেষ্টা করেনি।

কিন্তু ওর দিনের পর দিন পাওয়া শারীরিক আর মানসিক কষ্ট দেখে শৌনক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে নতুন করে আর কিছু নয়।  এটা কিছুতেই আনিশা বোঝাতে পারেনা যে বাড়িতে একটা বাচ্চার উপস্থিতি কত জরুরি। তাও বাড়ির অন্য সদস্যদের কোনো অনুঘটক উপস্থিতি নেই। খুব কাছের কিছু মানুষ ছাড়া কেউ এ এসব নিয়ে বেশি কথা বার্তা বলেনা ওদের সাথে। হয়তো শাশুড়িমা বলে রেখেছেন না জিজ্ঞেস করতে। আনিশা মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যায়, কি করে উনি আনিশাকে এত ভালো বোঝেন। একদিন দুপুরে একটা ছোট্ট মেয়ের প্রাণচঞ্চলতায় বাড়ি ভরিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে খুব মনমরা হয়েছিল আনিশা। আর অবাক কান্ড! শাশুড়িমা ওর মুখ দেখেই বুঝে গেলেন ওর মন খারাপের কারণ। আর সাথে বকাবকি।

– “তুমি এত স্মার্ট মেয়ে, আর এটাকে স্মার্টলি নিতে পারছ না? এরকম বাচ্চা না হওয়া দম্পতি প্রচুর আছে। না হলে কি করবে বলতো। একদম ওসব নিয়ে ভাববে না। আর তোমার প্রবলেম বলে এত মন খারাপ করছো, এটা তো তোমার বদলে আমার ছেলেরও হতে পারতো। সংসার তো দুজনের সমান ভাবে হয়। একা একা এসব ভেবে কষ্ট পাবে না একদম।” এটা শোনার পর থেকে অনেকটা বদলে দিয়েছে আনিশা নিজেকে।

যদিও ডক্টরের কথামতো একটা অপেরাশন কিছুদিন আগেই হয়েছে আনিশার, আর ডক্টর ভরসাও দিয়েছেন, কিন্তু শৌনক সেটাকে বেশি গুরুত্ব দিতে নারাজ।  বাড়ি ফিরে বাথরুমে ঢুকেই বুঝতে পারলো আনিশা, এমাসেও সত্যিই হলো না। এসে গেছে সেই রক্ত, তার মা না হতে পারার জানান নিয়ে। এবার সত্যিই মনস্থির করে ফেললো আনিশা। আর নয়, কালকেই CARA-তে রেজিস্ট্রেশনটা করে ফেলবে।

শৌনকই ঠিক। এভাবে অপেক্ষা করে করে দিন পার করার থেকে দত্তক নেওয়ার কাজকর্ম শুরু করে দেওয়াই ভালো। প্রায় মাস তিনেক পর। আনিশা আর শৌনক গেছে একটা অনাথ আশ্রমে। ওদেরকে দেখা করতে বলেছিল রেজিস্ট্রেশন প্রসিডিউর শেষ হবার পর। আর তারপর থেকেই চোখ বুজলেই আবার সেই ছোট্ট হাত আর পা দেখতে পাচ্ছে আনিশা। খিলখিলিয়ে হাসি। দোলনায় ঘুম। ভেবেই আনন্দে মনটা ভরে যাচ্ছে খালি। যদিও ও জানে, সব কাজকর্ম শেষ হতে হতে আরো কিছু মাস কেটে যাবে। ওরা বাচ্চা না ফাইনাল করে কিছু জানাবে না। তাও আনন্দে তর সইছেনা আনিশার। বাড়ি ফিরে হঠাৎ ক্যালেন্ডার দেখে চমকে গেল আনিশা।

প্রায় দশদিন হয়ে গেল আবার সেই ডেট মিস। দোনামোনা করতে করতে পরদিন কিট কিনে আনলো আনিশা। চুপচাপ উঠে পরদিন সকালে বাথরুম গিয়ে নিজেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পরছিলনা আনিশা। সবার সমস্ত নিরাশা আশঙ্কাকে দূর করে আনিশার মাতৃত্বের চিহ্ন নিয়ে গোলাপি রেখাদুটো ওর দিকেই তাকিয়ে। ঘরে গিয়ে শৌনককে ডেকে তুলে দেখালো আনিশা। শৌনক আগে ডক্টর দেখাতে বললো। পরদিন ডক্টর সোনোগ্রাফি করে প্রেগন্যান্সি কনফার্ম করলেন।

পুরো বাড়িতে খুশির হাওয়া। আর আনিশা নিজে তো সপ্তম স্বর্গে। কথা দিয়ে যে দিনগুলো কেটে যেতে থাকলো, ওর কোনো হিসেবই থাকলো না। হঠাৎ একদিন অনাথ আশ্রমটা থেকে একটা ফোন এলো, ওদের জন্য একটা মেয়ে বাছা হয়েছে। ওরা এসে দেখে যেন সম্মতি জানিয়ে যায়। তাহলে পরের প্রসিডিউর শুরু করা যাবে। শৌনক অনিশাকেই জিজ্ঞেস করলো যে ও কি চায়। কিন্তু তারপর জানতে পারলো যে এই অবস্থায় ওদের থেকে বেশি গুরুত্ত্ব পায় একদম নিঃসন্তান দম্পতিরা। ওদের পুরো দত্তক নেওয়ার রেজিস্ট্রেশনটাই বাতিল হয়ে গেল।

শুধু আনিশা নিজের সদ্যজাত সন্তানের দিকে তাকিয়ে ভাবলো, একটা অনাথ বাচ্চা নিজের পরিবার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল। আনিশার স্বপ্নের দোলনাটা শূন্যই থেকে গেল। নিজের সন্তানের ভালোবাসার সাথে হয়তো কিছুরই তুলনা নেই। কিন্তু না দেখে এতটুকু স্পর্শ না পেয়ে যাকে অকুন্ঠ ভালোবেসে ফেলেছিল আনিশা, তার প্রতি ভালোবাসায় কোনো খামতি নেই যে। হয়তো তার সেই খুশিরই প্রকাশ আনিশার নিজের সন্তান।

মাঝেমাঝেই এখনো লুকিয়ে চোখের জল ফেলে আনিশা। আর বলে, “আমাকে ক্ষমা করে দিস মা। এই জন্মে হলো না। পরের জন্মে তোরা দুজনেই আমার কোলে একসাথে আসিস”।

Disclaimer: The views, opinions and positions (including content in any form) expressed within this post are those of the author alone. The accuracy, completeness and validity of any statements made within this article are not guaranteed. We accept no liability for any errors, omissions or representations. The responsibility for intellectual property rights of this content rests with the author and any liability with regards to infringement of intellectual property rights remains with him/her.

Previous articleOnly Having a Job Doesn’t Make You an Independent Woman
Next articleGhuto: A Healthy Nutritious Recipe, Loaded With Green Vegetables and Lentils