মেঘরঙা মেয়েতামান্না জেনিফার ও দাদু, দাদু…আমাকে বিয়ে দিবা কবে?

মেঘরঙা মেয়েতামান্না জেনিফার ও দাদু, দাদু...আমাকে বিয়ে দিবা কবে?

বছরের তিথির মুখে এমন কথা শুনে হেসে লুটোপুটি খান দাদু একরাম উদ্দীন ৷ হাক ছেড়ে ছেলের বউকে ডাকেন তিনি..

ও বউমা শুনছো,,দেখো আমার বইনে কি কয়…হাহাহা”

তিথির মা সুমনা আড়াল থেকে মুখে আঁচল চেপে হাসে ৷ এই ছোট্ট তিথিই তাদের সারা বাড়ির সুখ..সারাদিন তাথৈ তাথৈ করে নেচে গেয়ে বাড়িটা যেন ভরিয়ে রাখে ৷ বাবার চোখের মনি,দাদুর আদরের বুবু আর মায়ের নিঃশ্বাস ৷ তবুও যেন কোথাও একটা সুরকাটা ভাব…

 গায়ের রংটা ওর বাবা বা দাদাবাড়ির কারো মতো ওমন দুধে আলতা হয়নি ওর ৷ বরং মায়ের মতো শ্যামলা গায়ের রং..এ নিয়ে আজ ছবছর ধরে কথা শুনে চলেছে সুমনা ৷ শ্বাশুড়ি রাহেলা বেগম নিজে হলেন অপরুপ সুন্দরী ৷ অমন কালো নাতনিটি তাই তার বড্ড অপছন্দের ৷ নাতনিকে কালী কয়লা ছাড়া তাকে ডাকতে শোনা যায়না কখনো.. 

দাদু আর তিথির এমন আহ্লাদ দেখে রাহেলা বেগম মুখ খুললেন…””মরন !! যে না চেহারা,তার আবার বিয়ে..তোর মায়ের মতো কাউকে ভুলিয়ে ভালিয়ে যদি তার গলায় ঝুলতে পারিস..ছিরি দেখো কথার,,বেলজ্জা বেশরম মাইয়্যা…””

মেঘরঙা মেয়েতামান্না জেনিফার ও দাদু, দাদু...আমাকে বিয়ে দিবা কবে?

 একরাম উদ্দীন বলে উঠেন ..””আহ,রাহেলা..কি শুরু করলে তুমি..একটা দুধের শিশুকে এসব কি বলতাছো খেয়াল আছে তোমার !!””

 “”মরন !! সত্যি কথা কইলেই গায়ে ফোস্কা পরে..আমারে না চুপ করায়া বরং নাতনীরে কিছু স্নো পাউডার কিন্না দেন..তাও যদি একটু ছিরিখান ঠিক হয়..যেমন মাও তার তেমন ছাও…সবি আমার কপাল…”” বিলাপ করতে করতে রাহেলা বেগম বাড়ির বাইরে চলে যান..

ওদিকে ছোট্ট তিথিকে যেন এসব বাকবিতন্ডা স্পর্শ করতে পারেনা ৷ নিজের পুতুল দুটো নিয়ে আপন মনে বারান্দায় বসে খেলছে সে ৷ আর অপেক্ষা করছে তার বাবা কখন আসবে..বাবাকে যে সে তার পুতুলের জন্য নতুন শাড়ী আনতে বলেছে ৷ কাল তার পুতুলের বিয়ে তার সই সাদিয়ার পুতুলের সাথে ৷ “”নাহ,বাবার আসতে দেরী আছে,তারচেয়ে না হয় একটু সাদিয়ার সাথে খেলিগে যাই”” ভাবতে ভাবতেই একটা ভো দৌড় দেয় সাদিয়াদের বাড়িতে..

সাদিয়ার মা উঠোনে বসে মাছ কাটছিলেন ৷ তিথিকে দেখেই জিজ্ঞেস করলেন “”কি রে তোদের নাকি পুতুলের বিয়া?”” তিথি ঘাড় দুলিয়ে উত্তর দেয় “”হ্যা তো”” ৷ সাদিয়ার মা হেসে হেসে বলেন “”দে দে ,,পুতুলেরই বিয়া দে…যে তোর গায়ের রং..বিয়া হইতে খবর আছে..””

তিথির ভীষন খারাপ লাগে..নিজের হাতের দিকে তাঁকিয়ে ভাবে কেন সে এত কালো..তার দাদীও একি কথা বলছিল আজ..কস্টে তিথির চোখে পানি চলে আসে…

 সুমনা আর তুরাগ ছিল সহপাঠী ৷ বিশ্ববিদ্যালয়ে একি সাথে পড়তো তারা ৷ সুমনা খুব ভালো ডিবেট করতো,আবৃতি করতো ৷ নবীন বরনের দিন সুমনা ভরাট গলায় আবৃত্তি করেছিল 

মেঘ বলল যাবি

 অনেক দূরের গেরুয়া নদী

অনেক দূরের একলা পাহাড়

অনেক দূরের গহন সে বন

গেলেই দেখতে পাবি..”

সেদিন সুমনার কবিতা শুনেই ওর প্রেমে পরেছিল তুরাগ ৷ বাবা মার একমাত্র ছেলে ৷ ভীষন সুন্দর দেখতে যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা কেউ ৷ যেকোন মেয়েই যাকে পছন্দ করবে নির্দ্বিধায় ৷ অথচ সুমনা দেখতে শুনতে তেমন না,শ্যামলা মুখে বিষাদের ছায়া ৷ 

তুরাগ যখন সুমনাকে ভালোবাসি বলে তখন যেন মরমে মরে যাচ্ছিল সে ৷ তুরাগকে সে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় এ সম্পর্কে সে রাজী না ৷কারন ছোটবেলা থেকেই নিজের গায়ের রং নিয়ে এত তুচ্ছ তাচ্ছিল্য সয়েছে সে যে তার মনে হতে থাকে তুরাগ তার সঙ্গে ঠাট্টা করছে ৷ এসব হয়তো মোহ,কদিন পর যখন আর থাকবে না মোহটা তখন ঠিক ওকে আস্তাকুরে ফেলে দেবে তুরাগ ৷

সুমনার ধারনা ভুল ছিল ৷টানা দু বছর রোজ কোন না কোন ফুল হাতে সুমনার সামনে গিয়ে দাড়াতো ৷ একসময় সুমনা বোঝে তুরাগ তাকে আসলেও ভালোবাসে ৷ এমন ভালোবাসা উপেক্ষা করার শক্তি সুমনার ছিলনা ৷ সাড়া দেয় সে তুরাগের গহীন ভালোবাসায়.. 

এরপর তিনটে বছর ওরা শুধু একে অপরে মেতে থাকে ৷ সহপাঠী থেকে শুরু করে অজানা অচেনা লোকেরাও ওদের নিয়ে কটুক্তি করতে থাকে ৷ “”দেখ দেখ রাজপুত্রের পাশে ঘুটে কুড়ুনি””অথবা “”ছেলের রুচি কি ভয়ানক,মাগো!!”” এসব শুনে মাঝে মাঝেই ভেঙে পরে সুমনা ৷ তবে তুরাগের এসবে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই.. 

এরপর আসে বিয়ের সময় ৷ সুমনার পরিবার থেকে কোন ঝামেলাই ছিলনা ৷ তুরাগের বাবাও প্রথম দেখাতেই সুমনাকে ভীষন পছন্দ করে ৷ তবে বিয়েতে বাধ সাধলো রাহেলা বেগম,তুরাগের মা ৷ কোন মতেই মেয়ের গুন দেখতে নারাজ তিনি ৷ তার কথা একটাই “”দুনিয়াতে কি মাইয়্যার অভাব পরছে !! এমন কালো মাইয়্যা তার ঘরের কাজের মেয়ে হবারও যোগ্য না “” অনেক যুদ্ধ শেষে বলতে গেলে একদম বাধ্য হয়েই বিয়েতে মত দেন রাহেলা বেগম ৷ 

অবশেষে সুমনা বউ সাজে..তার ভালোবাসার তুরাগের বউ …

তবে বিপত্তি গুলো যেন কেবল শুরু হলো মাত্র…

 সারাদিন শত শত কাজ করেও যেন কিছুতেই মন পেত না সে রাহেলা বেগমের ৷ বান্দীর বেটি ছাড়া কখনও ডাকেন না তিনি সুমনাকে ৷ সারাদিন পাড়ায় টো টো করে ঘুরে বেড়ান আর শাপ সাপান্ত করেন সুমনাকে ৷ সবাইকে বলে বেড়ান “”আমার ওমন রাজপুত্রের মতো ছেলে….ওই কালনাগিনী কালা জাদু করে রাখছে আমার মানিকটাকে…””

 এভাবেই দিন যাচ্ছিল ৷ একদিন সুমনা বোঝে তার ভিতরে অন্য একজনের অস্তিত্ব ৷ সুমনার মনে হতে থাকে তার মতো সুখী কেউ নেই ৷ অনেকদিন পর কবিতার বই হাতে নেয় সে ৷ অনেকদিন পর নিজেকে ভালোবাসে সে ৷ 

খবর শোনার পর রাহেলা বেগমের মনে হয় সুমনাকে বোধহয় আর তাড়ানো হলোনা ৷ গম্ভীর গলায় গিয়ে সুমনাকে বলেন “”বাচ্চা হইবো ভালো কথা ৷তয় এ জন্য যেন ঘরের কাজে কোন গাফিলতি না হয় ৷আর আমার নাতি চাই ৷ মাইয়্যা যেন না হয়…বংশের পয়লা সন্তান ছেলেই হওয়া চাই”””

ধীরে ধীরে নমাস শেষ হয় ৷ সুমনার ঘর আলো করে তিথি আসে ৷ তিথি দেখে সুমনা আর রাহেলা বেগম দুজনই খুব কেঁদেছিল তবে সুমনা কেঁদেছিল সুখে আর রাহেলা বেগম কস্টে ৷ একেতো মেয়ে তার উপর মায়ের গায়ের রং……সারাদিন অভিশাপ দিতেন ফুলের মতো তিথি আর সুমনাকে…””এত লোকে মরে তোগো মরন নাই…মরিস না তোরা আমার হাড় জুড়ায়….””

এসব শুনে সুমনা আড়ালে বসে কাঁদতো..আর আল্লাহকে বলতো “”করুনাময় আমার সন্তানকে তুমি ভালো রেখো “” তবে প্রতিবাদ সে করতো না কখনো ৷তুরাগ বলতো “” আমি আর বাবা সারাদিন থাকিনা…তুমি কোন অন্যায় সহ্য করোনা…প্রতিবাদ করো…”” ৷তবে সুমনা ভাবতো আল্লাহ সব দেখছেন…

ছয়টা বছর এভাবেই গেল..বিনা প্রতিবাদে অন্যায় সহ্য করে….সুখে অসুখে…..

তিথি সাদিয়াদের বাড়ি থেকে এসে আপন মনে আবার পুতুল নিয়ে বসে ৷ ছোট্ট তিথির পরিস্কার মন…একটু আগেই যে কথাতে তার গাল ভিজেছিল এখন বেমালুম ভুলে গেছে সে..

 রাহেলা বেগম পাড়ার আড্ডা শেষে বাড়িতে ঢুকছিলেন…তিথি দাদীকে দেখে আহ্লাদ করে বলে “দাদী…দেখোতো আমার পুতুল সোনাকে কেমন লাগছে…” ৷ রাহেলা বেগম খেঁকিয়ে উঠেন তিথির কথায় ” মরন ! এই আমাকে ছুস না অলক্ষী..তোরে দেখলেই আমার চোখে জ্বালা করে…মরতে পারিস না তুই….কালী কয়লা…”

রান্নাঘর থেকে সব শুনছিল সুমনা ৷ এত বছরের ধৈর্য্য আজ যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়…অনেক হয়েছে আরনা…সুমনা রান্নাঘর থেকে এসে তিথিকে কোলে তুলে নেয় ৷ তারপর বলে “””অনেক বলেছেন মা..এবার থামুন..আপনি শুধু ওর গায়ের রংটাই দেখেন,,ওর মায়া ভরা চোখ দেখতে পান না?? কেন এত অভিশাপ দেন ওকে…অনেক বেশী বলে ফেলেছেন..আমার সন্তান আমারই…কালো হোক যেমনই হোক ওকে ওর শৈশবটা আনন্দে কাটাতে দিন…”””তারপর তিথিকে বলেন “””মারে,তুই দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর বাচ্চা..বাবা মায়ের আদরের ধন…লোকের কথায় কান দিবিনা..তুই বড় হ তোর মতো করে…”” 

বিশ বছর পর…

তিথি আজ হাইকোর্টের উকিল ৷ নির্যাতিত মেয়েদের জন্য কাজ করে ৷ না,তিথি লোকের কথায় ভেঙে পরেনি ৷তিথি বড় হয়েছে ওর নিজের মতো করে ৷ নিজেকে পন্য নয়…মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে..

Disclaimer: The views, opinions and positions (including content in any form) expressed within this post are those of the author alone. The accuracy, completeness and validity of any statements made within this article are not guaranteed. We accept no liability for any errors, omissions or representations. The responsibility for intellectual property rights of this content rests with the author and any liability with regards to infringement of intellectual property rights remains with him/her.