সন্তান ছোট বলে মনে করবেন না যে তার রাগ বা অভিমান হয় না বা হতে নেই

ছোটদেরও রাগ বা অভিমান হয়

একদিন সন্ধ্যেবেলা আমি আমার ছেলেকে পড়াতে বসিয়েছি| সেইসময়ে আমার মা এলো| আমি দরজা খুলতেই মা জিজ্ঞেস করলো, “বাবু ( আমার ছেলে ) কোথায়?” আমি বললাম – “ঘরে, পড়তে বসেছে”| মা আমার সাথে আর কোনো কথা না বলে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে চলে গেলো আমাদের ঘরে| আমিও মায়ের পিছন পিছন উপরে উঠে এলাম|



উপরে আমাদের বসার ঘর পেরিয়ে আমাদের ঘরে যেতে হয়| আমি বসার ঘর অব্ধি পৌঁছেই আমার ছেলের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম – “আমি এখন পড়ছি”| ভাবলাম, অন্য সময় ‘দিদানমা’কে দেখলেই যে ছেলে সব ভুলে ‘দিদানমা……’ বলে লাফিয়ে ওঠে, তার আজ হলো কি? ওদিকে দিদানমা-এর ব্যাকুল আর্তি – “কি হয়েছে দাদা? আমার ওপরে রাগ করেছো?” বুঝলাম , এ তো মান-অভিমানের পালা| আমি তাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি, গিয়ে কাজ নেই বাবা| তাই আমি মায়ের জন্যে চা বানাতে সোজা চলে গেলাম রান্নাঘরে| চা নিয়ে যখন ঘরে এলাম, তখন দিদানমা-এর কোলে গম্ভীর মুখে চুপ করে বসে আদর খাচ্ছেন ছোট্ট অভিমানী মানুষটি| আর তার অভিমান ভাঙাতে ব্যস্ত দিদানমা-এর অক্লান্ত প্রচেষ্টা|



এবার আপনাদের আরো কয়েকটি দিন আগের একটি ছোট্ট ঘটনা বলি| আমার ছেলের কাছে ওর স্কুল ছুটি মানেই ওকে ওর দিদানমা-এর বাড়িতে রেখে আসতে হবে| দিদানমা, যাকে ও প্রথম নিজে থেকেই ‘মা’ বলতে শেখে| পরে ওকে ‘দিদান’ ডাকতে শেখানো হয়| আর এই ‘মা’ এবং ‘দিদান’-এর মেলবন্ধনেই ওর নিজস্ব ডাক ‘দিদানমা’| দিদানমা-ই হলো ওর সবচাইতে প্রিয়, সব চাইতে কাছের, আপনজন| প্রতিদিন ফোনে অন্তত একবার দিদানমা-এর সাথে কথা না বললে ওর চলেই না| এমনকি যখন ও দিদানমা -এর কাছে থাকে তখন ও সেখানে আমাকেও চায় না|

গত সপ্তাহে ওর স্কুল দু’দিন ছুটি ছিল| তার আগেরদিন ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম আমার মায়ের কাছে| বিশেষ কারণে মা ওই সময়ে ব্যস্ত থাকায়, ওকে আর ওর দিদানমায়ের কাছে রেখে আসা হয়নি| অতএব বাবুর খুব অভিমান হয়েছে দিদানমায়ের উপরে| কেন দিদানমা ওকে নিজের কাছে না রেখে আমাদের সাথে বাড়ি ফিরতে দিলো| এতটাই অভিমান যে পুরো এক সপ্তাহ সে আর ফোনে একবার -ও দিদানমায়ের সাথে কথাই বলেনি| যখনি তার দিদানমা ফোন করে তার সাথে কথা বলতে চেয়েছে তখনি সে খুব ব্যস্ত| হয় পড়ছে, না হয় আঁকছে, অথবা খেলছে, কিছু না কিছু করছে অথবা তার বক্তব্য – “আমি এখন কথা বলবো না”| তার এরকম ব্যবহারে খুব অবাক হয়েছি| বুঝিয়েছি বড়রা ফোন করে কথা বলতে চাইলে কথা বলতে হয়| কখনো বা শাসনও করেছি| কিন্তু বুঝতে পারিনি মাত্র পাঁচ ছুঁই ছুঁই ছেলের এতটা অভিমান হতে পারে| আমার মা কিন্তু দূরে থেকেও টের পেয়েছে তাঁর দাদার অভিমান| বুঝতে পেরে ছুটে চলে এসেছে সেই অভিমান ভাঙাতে| কারণ এই অভিমান যে আর কেউ ভাঙাতে পারবে না| শেষ অব্ধি সফলও হয়েছে| বাড়ি ফেরার আগে দিদানমা তাঁর ছোট্ট দাদাকে কথা দিয়ে গেছে, পরেরবার ছুটিতে সে অবশ্যই থাকবে দিদানমায়ের কাছে|

এই ছোট্ট ঘটনাটি আমি সকলের সাথে ভাগ করে, সকলের, বিশেষ করে যাঁরা আমার মতোই ছোট সন্তানের মা, তাঁদের উদ্দ্যেশ্যে বলতে চাই – আপনার সন্তানটি ছোট বলেই মনে করবেন না যে তার রাগ বা অভিমান হয় না বা হতে নেই| তার অভিমানকে বোঝার চেষ্টা করবেন| না বুঝে, খারাপ আচরণ ভেবে এমন কিছু করবেন না যাতে তার অভিমান, রাগ বা জিদে পরিনত হয়| বরং বুঝে, সেই অভিমান ভাঙাবার চেষ্টা করুন| একজন মা রূপে আমার অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি – ছোট বাচ্চাদের মন সহজ এবং সরল| তাই বড়দের যেকোনো প্রকার ব্যবহার ওদের মনে খুব সহজেই ছাপ ফেলে| ওদেরও অভিমান হয় আর সেই অভিমান ভাঙাবার দায়িত্ব কিন্ত বড়দেরই|

Disclaimer: The views, opinions and positions (including content in any form) expressed within this post are those of the author alone. The accuracy, completeness and validity of any statements made within this article are not guaranteed. We accept no liability for any errors, omissions or representations. The responsibility for intellectual property rights of this content rests with the author and any liability with regards to infringement of intellectual property rights remains with him/her.